মেদিনীপুর: বঙ্গ রাজনীতির মানচিত্রে বরাবরই অত্যন্ত রাজনৈতিক সচেতন জেলা হিসেবে পরিচিত পশ্চিম মেদিনীপুর। রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, এখানকার মানুষ যখন যে রাজনৈতিক দলকে আশীর্বাদ করেছেন, একেবারে দু’হাত ভরে দিয়েছেন। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বামেদের লালদুর্গ থাকার পর, প্রায় দেড় দশক এই জেলা ছিল সবুজ অর্থাৎ তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি। আর এবারের নির্বাচনে সেই জায়গা দখল করেছে গেরুয়া শিবির। জেলার মোট ১৫টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১৩টিতেই বিপুল ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে এনেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। কিন্তু অভাবনীয় এই সাফল্যের পরেও রাজ্যের নতুন মন্ত্রিসভায় পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা থেকে মাত্র একজন বিধায়কই জায়গা পেয়েছেন। মন্ত্রিসভায় একমাত্র দিলীপ ঘোষের অন্তর্ভুক্তিতে জেলাবাসী তাঁকে স্বাগত জানালেও, আরও দু-একজন বিধায়ককে মন্ত্রী করলে ভালো হতো বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। আর এই আক্ষেপের পাশাপাশি বঞ্চনার অভিযোগে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে খোদ গেরুয়া শিবিরের অন্দরেও।
দীর্ঘদিনের বামফ্রন্ট শাসনে এই জেলা থেকে সুশান্ত ঘোষ বা সূর্যকান্ত মিশ্রের মতো নেতারা মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্বও সামলেছেন। ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পরেও এই জেলা থেকে মানস ভুঁইয়া, শ্রীকান্ত মাহাতো বা শিউলি সাহার মতো একাধিক নেতা-নেত্রীকে প্রশাসনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখা গিয়েছে। যার ফলে নানা সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও জেলার উন্নয়নমূলক কাজ বরাবরই একটা আলাদা গতি পেয়েছে। এবারের নির্বাচনে দুর্নীতি-সহ একাধিক ইস্যুকে হাতিয়ার করে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়েছে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের কর্মীদের দাবি, প্রথমদিকে সংখ্যায় কম হলেও গ্রামে গ্রামে কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং নিরবচ্ছিন্ন জনসংযোগের ফলেই ১৫টির মধ্যে ১৩টি আসনে এই বিপুল জয়লাভ সম্ভব হয়েছে। রাজ্যে দলের ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে পশ্চিম মেদিনীপুরের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা মাথায় রেখে স্বাভাবিকভাবেই আশা করা হয়েছিল যে, এবারের মন্ত্রিসভাতেও জেলার একাধিক বিধায়ক জায়গা পাবেন। কিন্তু মন্ত্রীদের তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, একমাত্র দিলীপ ঘোষ ছাড়া আর কেউই মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাননি। দলের একাংশের স্পষ্ট দাবি, যে জেলা বিজেপিকে এমন বিপুল সাফল্য উপহার দিল, মন্ত্রিসভা গঠনের সময় সেই জেলাকে আরও একটু বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল।
দলের এই সিদ্ধান্তের জেরে জেলার বিজেপি কর্মীদের মধ্যে যে তীব্র হতাশা তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বিভিন্ন স্তরের নেতাদের কথায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলার এক প্রথম সারির বিজেপি নেতার কথায়, পূর্ব মেদিনীপুর থেকে একাধিক মন্ত্রী করা হয়েছে, এমনকি ঝাড়গ্রামের মতো তুলনামূলক ছোট জেলা থেকেও দু’জন বিধায়ক মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। অথচ ১৩ জন বিধায়ক জয়ী হওয়ার পরেও পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে মাত্র একজন মন্ত্রী হওয়ায় রীতিমতো হতাশা তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, এই জেলার সাংগঠনিক শক্তি এবং রাজনৈতিক অবদানকে শীর্ষ নেতৃত্বের আরও বেশি মর্যাদা দেওয়া উচিত ছিল। একই সুর শোনা গিয়েছে জেলার বিজেপি নেতা অপরূপ বক্সির গলাতেও। তিনি জানান, ১৩ জন বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর মাত্র একজন মন্ত্রী হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সকলের মন খারাপ। আরও কয়েকজন মন্ত্রী হলে জেলার মানুষ নিজেদের প্রতিনিধিত্ব আরও বেশি করে অনুভব করতে পারতেন। শুধু রাজনৈতিক মহলই নয়, জেলার অন্যান্য বিশিষ্টজনেরাও এই সিদ্ধান্তে হতাশ। মেদিনীপুর আদালতের আইনজীবী মন্মথ দে জানিয়েছেন, নির্বাচিত বিধায়কদের মধ্যে অনেকেই অত্যন্ত যোগ্য এবং অভিজ্ঞ। বিশেষ করে মেদিনীপুরের বিধায়ক অরূপের মতো পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষিত মানুষও রয়েছেন। দক্ষ ও যোগ্যদের মধ্য থেকে আরও কয়েকজন মন্ত্রী হবেন বলে তাঁরা আশা করেছিলেন। তবে আগামী দিনে এই জেলার গুরুত্ব বিবেচনা করে মন্ত্রিসভায় আরও বেশি প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হবে বলেই আশাবাদী তিনি।








