Home » Editorial » ঐতিহ্য রক্ষার নামে ‘রংচঙে’ মেরামতি? নয়াগ্রামের প্রাচীন রামেশ্বর মন্দির ঘিরে উঠছে সংরক্ষণ-বিতর্ক

ঐতিহ্য রক্ষার নামে ‘রংচঙে’ মেরামতি? নয়াগ্রামের প্রাচীন রামেশ্বর মন্দির ঘিরে উঠছে সংরক্ষণ-বিতর্ক

Share:

ঝাড়গ্রামের নয়াগ্রামের রামেশ্বর মন্দির শুধু একটি পূজাস্থল নয়, এটি জঙ্গলমহলের ঐতিহাসিক, লোকস্মৃতি-নির্ভর এবং পর্যটন-সম্ভাবনাময় এক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য-চিহ্ন। ঝাড়গ্রাম জেলার সরকারি “Places of Interest” পাতায়ও এই মন্দিরকে প্রায় ষোড়শ শতকের, রাজা চন্দ্রকেতু-নির্মিত, ওড়িয়া স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সূত্রে উল্লেখ আছে, গঙ্গাবারুণী উপলক্ষে এখানে বড় মেলা বসে।
মন্দিরটিকে ঘিরে লোকবিশ্বাসও কম নয়। নানা ভ্রমণ-নিবন্ধ, স্থানীয় বর্ণনা এবং তপোবন-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে রাম-সীতা, বিশ্বকর্মা, বাল্মীকির আশ্রম, সীতাকুণ্ড, সীতানালা, লব-কুশের কাহিনি—সব মিলিয়ে রামেশ্বর-তপোবন অঞ্চলটি বহুস্তরীয় সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য হিসেবে উঠে আসে। এই তপোবন এলাকাকে ঝাড়গ্রাম থেকে প্রায় ৬৪ কিলোমিটার দূরের এক উল্লেখযোগ্য ধর্ম-পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সংবাদমাধ্যমেও বর্ণনা করা হয়েছে।
কিন্তু অভিযোগ উঠছে, সংস্কারের নামে মন্দিরের মূল ঐতিহাসিক চরিত্রই নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় ইতিহাসচর্চার সঙ্গে যুক্ত মহল এবং সংরক্ষণ-সচেতনদের বক্তব্য—প্রাচীন মন্দিরের ক্ষেত্রে “ঝকঝকে” চেহারা দেওয়াই সংরক্ষণ নয়; বরং তার প্রাথমিক উপাদান, পাথর, গঠনরীতি, ক্ষয়চিহ্ন, কারুকাজ, স্তরবিন্যাস এবং স্থাপত্য-ভাষাকে যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ণ রেখে পুনরুদ্ধার করাই আসল কাজ। এই আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে প্লাস্টিক পেন্টস অথবা চুনকাম, নতুন আবরণ, এবং এমন ভিজ্যুয়াল হস্তক্ষেপ যা মন্দিরের পুরনো মাকড়া পাথরের চরিত্রকে আড়াল করে দিয়েছে—এমনটাই অভিযোগ। ব্যবহারকারীর উল্লিখিত “এক কোটির বেশি” বরাদ্দের দাবিটি আমি স্বাধীনভাবে নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি থেকে যাচাই করতে পারিনি, তাই সেটিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত।
এই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: ঐতিহ্য সংরক্ষণ মানে কি নতুনের মতো সাজিয়ে দেওয়া, না কি পুরনোকে তার ইতিহাস-সমেত টিকিয়ে রাখা? সংরক্ষণ-নীতির স্বীকৃত কাঠামো কিন্তু দ্বিতীয় পথকেই গুরুত্ব দেয়। ইন্ট্যাকের চার্টার ও নির্দেশিকায় বারবার “minimal intervention” বা ন্যূনতম হস্তক্ষেপের কথা বলা হয়েছে—অর্থাৎ যত কম বদল ঘটিয়ে ঐতিহাসিক সত্তা, উপকরণ ও চরিত্র রক্ষা করা যায়, সেটাই আদর্শ।
বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণ সম্পর্কিত ইউনেস্কোর নথিতেও “authenticity” বা প্রামাণিকতা এবং “irreplaceable assets” বা অপূরণীয় ঐতিহ্য-সম্পদের ধারণাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, কোনও ঐতিহাসিক স্থাপনার মূল্য কেবল তার ধর্মীয় ব্যবহার বা পর্যটন-সুবিধায় নয়, তার আসল রূপ, উপাদান এবং উত্তরাধিকার-স্মৃতিতেও নিহিত।
এই কারণেই নয়াগ্রামের রামেশ্বর মন্দিরকে ঘিরে অভিযোগটি শুধু “চুনকাম হয়েছে” বলেই থেমে থাকছে না। বিষয়টি আসলে আরও গভীর। যদি সত্যিই মন্দিরের প্রাচীন মাকড়া পাথরের শরীরকে ঢেকে দিয়ে, ক্ষয়চিহ্ন মুছে দিয়ে, স্থাপত্যের যুগচরিত্র বদলে দেওয়া হয়ে থাকে, তা হলে সেটি সংস্কার নয়—ঐতিহ্যের উপর প্রশাসনিক ‘মেকওভার’। আর সেই মেকওভার যতই চকচকে হোক, ইতিহাসের চোখে তা ক্ষতি হিসেবেই গণ্য হতে পারে।
জঙ্গলমহলে পর্যটনের নামে সম্প্রতি একাধিক স্থানে সৌন্দর্যায়নের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সৌন্দর্যায়ন আর সংরক্ষণ এক জিনিস নয়। পর্যটক টানতে গিয়ে যদি ইতিহাস মুছে যায়, তা হলে শেষ পর্যন্ত জায়গাটির আলাদা পরিচয়ই নষ্ট হয়। নয়াগ্রামের রামেশ্বর মন্দিরের ক্ষেত্রেও এখন সেই আশঙ্কাই সামনে আসছে—একটি পুরনো, বহুস্তরীয়, লোকবিশ্বাসে মোড়া, ওড়িয়া ধাঁচের ঐতিহাসিক মন্দিরকে ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন’ করার নামে তার অতীতের চামড়া তুলে ফেলা হল কি না, সেই প্রশ্নই জোরাল হচ্ছে।
এই বিতর্কের পর স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি দাবি সামনে আসতে পারে: সংস্কারকাজের বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট প্রকাশ করা হোক; কাজের আগে ও পরে মন্দিরের ফটোগ্রাফিক নথি জনসমক্ষে আনা হোক; প্রত্নতত্ত্ববিদ, স্থাপত্য-সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ, ইতিহাসবিদ এবং স্থানীয় ঐতিহ্য-জ্ঞানী মানুষের সমন্বয়ে স্বাধীন মূল্যায়ন করা হোক; এবং ভবিষ্যতে রামেশ্বর-তপোবন জোনে যে কোনও হস্তক্ষেপের আগে বৈজ্ঞানিক heritage impact assessment বাধ্যতামূলক করা হোক। কারণ, রামেশ্বর শুধু একটি মন্দির নয়—এটি নয়াগ্রামের স্মৃতি, জঙ্গলমহলের সাংস্কৃতিক মানচিত্র, এবং ইতিহাসের হাতে লেখা এক জীবন্ত দলিল।

Leave a Comment