Home » Politics » ‘ইউরেকা’: বিনপুরে মিলে গেল আর্কিমিডিসের সূত্র, বিদায়ী বিধায়ক ‘অন্তর্ধান রহস্য’ উন্মোচন

‘ইউরেকা’: বিনপুরে মিলে গেল আর্কিমিডিসের সূত্র, বিদায়ী বিধায়ক ‘অন্তর্ধান রহস্য’ উন্মোচন

Share:

রাজনীতিতে প্রান্তিক প্রতিনিধিরা অনেক সময় বড় দাবার ছকের ঘুঁটি মাত্র। তথ্য (Data), আবেগ (Emotion) এবং দর্শন (Philosophy)—এই তিনের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে লেখার চেষ্টা করলাম। এটি সংবাদের অন্তরালে থাকা ‘অলিখিত সত্য’ বা ‘ইনসাইড স্টোরি’

‘ইউরেকা’: বিনপুরে মিলে গেল আর্কিমিডিসের সূত্র, বিদায়ী বিধায়ক ‘অন্তর্ধান রহস্য’ উন্মোচনম

মতামত এবং বিশ্লেষণে – সুনীপম মহাকুল

সোমবারের তপ্ত বেলপাহাড়ি। একদিকে টলিউড সুপারস্টার কোয়েল মল্লিকের গ্ল্যামারের ঝলকানি, আর তারই ঠিক পাশে ধুলোমাখা রাস্তায় টিকিট-হারানো এক ‘সাবলটার্ন’ বিধায়কের নিঃশব্দ পদচারণা। আর্কিমিডিসের সেই অপসারিত জলের অঙ্ক অবশেষে মিলেই গেল! জঙ্গলমহলের রাজনৈতিক চৌবাচ্চায় গত কয়েকদিন ধরে যে জল্পনার বুদবুদ তৈরি হয়েছিল, তা এক ঝটকায় মিলিয়ে গেল রোড-শোর ভিড়ে। বিনপুরে দেবনাথ হাঁসদার অন্তর্ধান এবং তাঁর সম্ভাব্য বিদ্রোহের জল্পনার ওপর থেকে যাবতীয় পর্দা সরে গেল। পদ যাওয়ার অপমান সযত্নে সরিয়ে রেখে, দেবনাথের এই উজ্জ্বল উপস্থিতি বিনপুরের রুক্ষ মাটিতে একটি অমোঘ রাজনৈতিক বার্তা দিয়ে গেল— “পদ নয়, পতাকাই শেষ কথা।”
“কাল তো গিয়েছিলেন।” মঙ্গলবার সামাজিক মাধ্যমের পাতায় দেওয়া নম্বরে কল করতে হিমাংশু দত্ত ফোন ধরলেন। মান অভিমানের প্রসঙ্গে হিংমাশুর বক্তব্য, “সেটা দেবনাথদার ব্যক্তিগত ব্যাপার।” ব্যাপারটা নারায়ণগড়ের সূর্য অট্টর মত কীনা হিমাংশু সে নিয়েও কিছু বললেন না।
অনুগামীদের তরফ থেকে এই সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দেয়, রাজনীতি যে কত বড় চিত্রনাট্যকার, বেলপাহাড়ির এই রোড-শো যেন তারই অকাট্য প্রমাণ। একটু পিছন ফিরে তাকালে সমীকরণটার তীব্র আয়রনি বা পরিহাস স্পষ্ট হবে। ভেবে দেখুন, যাঁর হলফনামায় মোট সম্পত্তির পরিমাণ মাত্র ৩.৬ লক্ষ টাকা, শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি, সেই তৃণমূল স্তরের সাধারণ সমাজকর্মী একুশের ভোটে ছিলেন ঘাসফুল শিবিরের তুরুপের তাস। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী যখন তাঁকে “পায়ের তলায়” রাখার কথা বলে উপজাতীয় সেন্টিমেন্ট উসকে দিয়েছিলেন, তখন এই দেবনাথই হয়ে উঠেছিলেন শাসক দলের আদিবাসী অস্মিতার অন্যতম বড় ঢাল। আর আজ? ছাব্বিশের রণাঙ্গনে সেই ‘ঢাল’-কেই কিনা হাসিমুখে হাঁটতে হচ্ছে তাঁকে সরিয়ে যাঁর হাতে টিকিট উঠেছে— সেই প্রাক্তন সাঁওতালি অভিনেত্রী ও বর্তমান মন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদার জয়ে সিলমোহর বসাতে! তাও আবার কোয়েল মল্লিকের মতো এক আদ্যোপান্ত শহুরে ‘স্টার পাওয়ার’-এর মিছিলে, যে কৌশলগত সমীকরণ তাঁকে তাঁর নিজের আসন থেকে উৎখাত করেছে।
এই রোড-শোয়ের সবচেয়ে করুণ দর্শক সম্ভবত জঙ্গলমহলের বিরোধী শিবির। চতুর্মুখী লড়াইয়ে যখন বিজেপির প্রণত টুডু, সিপিএমের রবি সিং সরদার এবং কংগ্রেসের গোলাপি সোরেন রীতিমতো ছিপ ফেলে বসেছিলেন দেবনাথের অভিমানের ঘোলা জলে মাছ ধরবেন বলে, তখন দেবনাথ কার্যত আস্ত পুকুরটাই শাসক দলের হাতে তুলে দিলেন। বিরোধীদের পাটিগণিত ছিল, বিক্ষুব্ধ দেবনাথ কমপক্ষে রাজনীতি নিরপেক্ষ অবস্থান নিলে উপজাতীয় ভোটব্যাংকে অন্তত কয়েক হাজার ভোটের ফাটল তো ধরাবেনই! কিন্তু আর্কিমিডিসের সূত্র মেনে চৌবাচ্চার জল উপচে পড়ে নতুন কোনও স্রোত তৈরি করল না, বরং দলের বৃহত্তর খাতেই তা নীরবে মিশে গেল।
নেপথ্যের আসল রসায়নটা অতি নির্মম। রাজনীতির কারবারিদের মতে, একজন প্রান্তিক প্রতিনিধিকে যখন বৃহত্তর রাজনৈতিক দাবার ছক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তখন তাঁর এই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আসলে আধুনিক কেন্দ্রীভূত দলীয় কাঠামোর নিখুঁত রিমোট-কন্ট্রোলকেই তুলে ধরে। নিজস্ব স্বাধীন গণভিত্তি বা ঝাড়খণ্ড পার্টির মতো কোনও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার দেবনাথের নেই, যা বীরবাহার আছে। তাই দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে সমান্তরাল লড়াই দাঁড় করানোর মতো রাজনৈতিক পুঁজি তাঁর পকেটে শূন্য। একুশে যিনি ছিলেন দলের ‘প্রয়োজন’, ছাব্বিশে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা কাটাতে তাঁকে সহজেই ‘ব্যয়যোগ্য’ ধরে নেওয়া গেল। দেবনাথ হাঁসদাও বুঝে নিলেন, এই বিশাল রাজনৈতিক যন্ত্রে তিনি একজন শৃঙ্খলাপরায়ণ সৈনিক মাত্র।
জঙ্গলমহলের উপজাতীয় রাজনীতির এই নিঃশব্দ আত্মত্যাগ শাসক দলের মাইক্রো-ম্যানেজমেন্টের এক চূড়ান্ত সাফল্যের দলিল। বিনপুরের হাই-ভোল্টেজ লড়াইয়ে দেবনাথের এই প্রকাশ্যে আসা বীরবাহা হাঁসদার জয়ের গাণিতিক পথকে মসৃণ তো করলই, পাশাপাশি এক রূঢ় সত্যকেও প্রতিষ্ঠা করল। রাজনীতিতে প্রান্তিক মানুষেরা ব্যবহৃত হয়েও শেষ পর্যন্ত দলের পতাকাকেই আঁকড়ে ধরে থাকতে বাধ্য হন, কারণ সেই পতাকার ছায়াই তাঁদের একমাত্র অস্তিত্ব। আর্কিমিডিসের পরীক্ষায় দেবনাথ সসম্মানে উত্তীর্ণ হলেন ঠিকই, স্নানঘর থেকে ‘ইউরেকা’ বলে দৌড়ে বেরোলেন তৃণমূলের ভোট-ম্যানেজাররা। আর জঙ্গলমহলের ইতিহাস আড়চোখে দেখে মুচকি হেসে লিখে রাখল— রাজনীতিতে ব্যক্তি বা পদের চেয়ে দলের আখ্যান শুধু বড়ই নয়, সেখানে গ্ল্যামারের কাছে আস্ত একটা সাবলটার্ন অস্তিত্ব কীভাবে কর্পূরের মতো উবে যায়! তৃণমূল কীভাবে দেবনাথের পুনর্বাসন করবে সেটা পরের কথা।

Leave a Comment