পাহাড়ের উন্নয়ন, বন্ধ চা বাগানের ভবিষ্যৎ, জিটিএ-র আর্থিক অচলাবস্থা থেকে দুর্নীতির অভিযোগ— একগুচ্ছ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে পাহাড় সফরের শুরুতেই বড় সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পরে তিনি জানালেন, পাহাড়ে নাগরিক পরিষেবা ও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে একাধিক পদক্ষেপ শুরু করছে সরকার। একই সঙ্গে জিটিএ-তে শিক্ষক নিয়োগ এবং ‘অমৃত’ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তের নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, পাহাড়ে উন্নয়নের বহু কাজ দীর্ঘদিন ধরে থমকে ছিল প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন চিফ সেক্রেটারি, হোম সেক্রেটারি, মিউনিসিপ্যাল অ্যাফেয়ার্স, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট-সহ একাধিক দফতরের শীর্ষকর্তা, দার্জিলিং ও কালিম্পঙের জেলাশাসক এবং জিটিএ-র প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি শমা পারভিন। রাজনৈতিক স্তরেও সাংসদ, বিধায়ক এবং পাহাড়ের বিভিন্ন শরিক নেতৃত্ব বৈঠকে অংশ নেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘পাহাড়ের বিষয়গুলোকে ডেভেলপমেন্ট ওরিয়েন্টেড দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হচ্ছে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় সংস্থাগুলিকে একসঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে।’’
চার পুরসভার মধ্যে শুধুমাত্র দার্জিলিংয়ে নির্বাচিত বোর্ড রয়েছে। বাকি তিনটিতে রাজনৈতিক প্রশাসকের পরিবর্তে মহকুমাশাসকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ‘‘পাহাড়ের মানুষ নাগরিক পরিষেবা এবং উন্নয়নের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না।’’
জিটিএ-র কাজকর্ম নিয়ে তোপ দেগে মুখ্যমন্ত্রী জানান, গত অর্থবর্ষে পাহাড়ের জন্য প্রায় ১৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও তা ব্যবহার হয়নি। এমনকি চলতি অর্থবর্ষে প্রায় ১৭০ কোটি টাকার সংস্থান থাকলেও বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা না দেওয়ায় এক টাকাও তোলা যায়নি। তাঁর অভিযোগ, ‘‘হোম বা পুলিশ বাদ দিয়ে জিটিএ-র উপর যে দায়িত্ব ছিল, সেগুলির কোনওটাই কার্যকর করার আগ্রহ দেখা যায়নি।’’
পাহাড়ের নাগরিক পরিকাঠামোতেও দ্রুত নজর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পানীয় জল, রাস্তা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষা, স্ট্রিট লাইট, পার্কিং, বাসস্ট্যান্ড থেকে পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে পরিকাঠামো— সব ক্ষেত্রেই দ্রুত কাজ শুরুর নির্দেশ গিয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিন বন্ধ চা বাগানগুলির প্রসঙ্গও উঠে আসে বৈঠকে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ প্যাকেজ থাকা সত্ত্বেও আগের সরকার উদ্যোগ না নেওয়ায় চা শ্রমিকেরা বঞ্চিত হয়েছেন। ‘‘অসম সরকার সুযোগ নিয়ে কাজ করেছে। আমাদের এখানে হাজার হাজার শ্রমিক এখনও কষ্টে আছেন,’’ বলেন তিনি। কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়ালের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে তাঁর দাবি, নিয়ম মেনে প্রস্তাব পাঠানো গেলে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত সহায়তা মিলতে পারে। সেই অর্থে পাহাড় থেকে তরাই পর্যন্ত চা শ্রমিকদের কল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
গত অক্টোবরে পাহাড়ে বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্যও আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রশাসনের তরফে জমি চিহ্নিত হলেও বাড়ি তৈরির অর্থ মেলেনি বলে অভিযোগ তুলে তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৯০টি পরিবারের জন্য তিন লক্ষ টাকা করে বরাদ্দ করা হয়েছে। দ্রুত বাড়ি নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসনকে।
একই সঙ্গে জিটিএ-র শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে সিবিআই তদন্তের পথ খুলে দেওয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, প্রায় ৪০০ শিক্ষককে বেআইনি ভাবে নিয়োগের অভিযোগে মামলা চলাকালীন রাজ্য সরকারের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা হবে। ‘‘আমরা মামলা থেকে বেরিয়ে এলে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী তদন্ত এগোতে পারবে,’’ বলেন তিনি।
‘অমৃত’ প্রকল্পে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকার জল সংযোগ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সাত দিনের মধ্যে বিশেষ তদন্ত দলের রিপোর্ট চেয়ে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে ‘ব্ল্যাকলিস্টেড’ রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সব শেষে পাহাড়বাসীর দীর্ঘদিনের দাবিকে সামনে রেখে কালিম্পঙে নতুন মেডিক্যাল কলেজ তৈরির পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। নতুন জেলাশাসককে জমি চিহ্নিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সাংসদ ও বিধায়কদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত ডিপিআর পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘যে চারটি জেলায় এখনও মেডিক্যাল কলেজ হয়নি, তার মধ্যে কালিম্পঙেও একটি মেডিক্যাল কলেজ গড়ে তোলার দিকে আমরা এগোচ্ছি।’’
সঙ্গে তিন বিধায়ককে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও পর্যটন কেন্দ্রগুলি দ্রুত পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়ে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ঘাটতির তালিকা তৈরির কথাও বলেন তিনি। তাঁর ইঙ্গিত, ‘‘যা দ্রুত দেওয়া সম্ভব, পনেরো দিনের মধ্যে তা মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হবে।’’
এখন নজর, পাহাড়ে ঘোষণার রাজনীতি ছেড়ে বাস্তবে কতটা দ্রুত কাজ শুরু হয়। অক্টোবরে পাহাড়ে ঘটে যাওয়া বিপর্যয়ের স্মৃতি টেনে এনে এ বার আগাম সতর্কতা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির বার্তা দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পাহাড়ের উন্নয়ন, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং প্রশাসনিক সক্রিয়তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ‘‘আমরা আশা করি, ঈশ্বরের কৃপায় গত অক্টোবরের মতো আর কোনও ডিসাস্টার হবে না। কিন্তু প্রস্তুতি থাকা জরুরি।’’
পাহাড়ে অতীতের প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি তিনি। নাম না করে পূর্বতন সরকারের দিকে আঙুল তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘গত বার আমরা দেখেছি, পুরো অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রেড রোডে কার্নিভালে ব্যস্ত ছিল। পাহাড়ে পৌঁছতে ৪৮ ঘণ্টা লেগেছিল। চিফ সেক্রেটারি, হোম সেক্রেটারি, ডিজিপি— সবাই উৎসবে ছিলেন, পাহাড় অবহেলিত হয়েছিল।’’ তাঁর দাবি, এ ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, সে জন্য আগেভাগেই বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরকে সক্রিয় করা হচ্ছে। ‘‘ডিসাস্টার ম্যানেজমেন্ট সেক্রেটারি এখনও যাবেন, প্রস্তুতি নেবেন। পাহাড়ের সঙ্গে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেটা দেখা আমাদের কর্তব্য,’’ বলেন তিনি।
একই সঙ্গে পাহাড় নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারও ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। হিন্দি ও নেপালি ভাষাভাষী মানুষের কথা মাথায় রেখে আংশিক হিন্দিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি জানান, পাহাড়কে ঘিরে ইতিমধ্যেই ‘‘হাই-লেভেল মিটিং’’ হয়েছে। সেই বৈঠকে পাহাড়ের সাংসদ, বিধায়ক, জোটসঙ্গী প্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ‘‘চিফ সেক্রেটারি বৈঠকের নেতৃত্ব দিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ দফতর, জেলাশাসকরা ছিলেন। জিটিএ-র সচিব ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। পাহাড়ে জিটিএ-র কাজ, পুরসভার কাজ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব— সব কিছু নিয়েই বিস্তারে আলোচনা হয়েছে,’’ বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
পাহাড়বাসীর উদ্দেশে আশ্বাসের সুরে তিনি বলেন, ‘‘পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিছু স্বল্পমেয়াদি কাজ হবে, কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও রয়েছে। আপনারা সরকারের উপর যে আশা রেখেছেন, তা পূরণে আমরা কাজ শুরু করব।’’
উন্নয়নের সেই বার্তার মধ্যেই কালিম্পঙে নতুন মেডিক্যাল কলেজ গড়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সূত্রের খবর, এ নিয়ে নতুন জেলাশাসককে উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের একাংশের মতে, পাহাড়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা জোরদারে এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের প্রশ্ন, পাহাড়ে উন্নয়ন ও বিপর্যয় মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। বাস্তবে কত দ্রুত তা মাটিতে নামে, সেটাই এখন দেখার।
সুনীপম মহাকুল








