শূন্য থেকে দশ। কল্পনার এক সিঁড়ি। অক্সফোর্ডের গবেষকেরা প্রতি বছর ১৪৭টি দেশের মানুষকে ওই সিঁড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করেন — “আজ, এই মুহূর্তে, আপনি নিজের জীবনকে কোথায় দেখছেন?” ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে ভারত উত্তর দিয়েছে: ৪.৫৪। ফল? ১৪৭ দেশের মধ্যে ১১৬ নম্বর। ফিনল্যান্ড টানা ন’বছর শীর্ষে, গড় নম্বর ৭.৭৬৪। আর পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি ভারত পড়ে রইল নেপাল ৯৯, পাকিস্তান ১০৪, শ্রীলঙ্কা ১৩৪ আর বাংলাদেশ ১২৭-এর নিচে।
*১. সুখের খতিয়ান: রোজগার বনাম রিলেশনশিপ*
রিপোর্ট বলছে, সুখ মাপা হয় ছ’টি কাঁটায়: মাথাপিছু আয়, সামাজিক সহায়তা, গড় আয়ু, স্বাধীনতা, উদারতা ও দুর্নীতি-ধারণা। ভারত আয়ে ৮৯, আয়ুতে ৯৫, স্বাধীনতায় ৬১, দুর্নীতিতে ৬৪—খুব খারাপ নয়। কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়েছে ‘সামাজিক সহায়তা’-য়: ১২৩ নম্বর। অর্থাৎ, বিপদে পড়লে ফোন করার মতো একজন ‘আপনজন’ খুঁজে পাওয়ার বিশ্বাসে আমরা বিশ্বের তলানির দিকে। অক্সফোর্ডের গবেষকেরা বারবার বলছেন, এই একটাই সূচক আয়ের চেয়েও জোরে সুখ টেনে তোলে।
*২. ইস্টারলিন প্যারাডক্সের ভারতীয় সংস্করণ*
অর্থনীতিবিদ টি. লক্ষ্মণস্বামী ও কে. মায়ার গবেষণা বলছে, ভারতে আয় বাড়লেও সুখ বাড়ছে না—কারণ আয়-বৈষম্য বাড়ছে, আর বৈষম্য বাড়লে জীবন-সন্তুষ্টির বৈষম্যও বাড়ে। ২০২৫-এর আরেক গবেষণায় উঠে এল, যাঁদের জীবন-সন্তুষ্টি আগে থেকেই কম, আয় বাড়লে তাঁদের সুখ কিছুটা বাড়ে; কিন্তু যাঁরা আগে থেকেই ‘খুশি’, তাঁদের ক্ষেত্রে আয়-বৃদ্ধির প্রভাব প্রায় নেই। এটাই ইস্টারলিন প্যারাডক্সের দেশি চেহারা।
*৩. ‘টু হ্যাপি টু ফাংশন’?*
পাবমেড-এ প্রকাশিত ২০২৬-এর এক গবেষণা বলছে, ভারতীয় সমাজে ‘খুশি থাকতেই হবে’—এই সামাজিক নর্ম জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে উল্টে চাপ ও ভঙ্গুরতা তৈরি করছে। খুশির পেছনে ছুটলে সুখ বাড়ে, কিন্তু ‘খুশি না থাকলে চলবে না’—এই চাপ সুখ কমায়। অর্থাৎ, আমরা হাসির মুখোশ পরে আছি, ভিতরে ফাঁপা।
*৪. বিদেশি মিডিয়া কী দেখছে?*
দ্য হিন্দুর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ‘বিলিফ ইন কমিউনিটি কাইন্ডনেস’ ও সামাজিক বিশ্বাস আয়ের চেয়ে বেশি সুখ দেয়। অথচ ভারতে ১৯% তরুণ বলছেন, বিপদে ভরসা করার মতো কেউ নেই—২০০৬-এর তুলনায় ৩৯% বৃদ্ধি। পরিযান, ডিজিটাল জীবন, শহুরে নিঃসঙ্গতা সম্পর্কের জাল ছিঁড়ে দিচ্ছে—‘সমৃদ্ধি আছে, সান্নিধ্য নেই’।
দ্য ওয়্যার মনে করিয়ে দিচ্ছে, গণতন্ত্রে অভিযোগ বেশি ওঠে, তাই পারসেপশন-ভিত্তিক সূচকে ভারত পিছিয়ে পড়ে। আবার ইন্ডিয়া টুডে নর্থ-ইস্টের ভাষায়: “বুমিং ইকোনমি, ব্রুইজড হ্যাপিনেস”—অর্থনীতি ফুলছে, মন শুকোচ্ছে।
*৫. প্রতিবেশীরা কোথায়?*
২০২৬-এর রিপোর্ট: চীন ৬৫, নেপাল ৯৯, পাকিস্তান ১০৪, মিয়ানমার ১২৯, শ্রীলঙ্কা ১৩৪, বাংলাদেশ ১২৭, আফগানিস্তান ১৪৭। যুদ্ধবিধ্বস্ত প্যালেস্টাইন ১০৯, ইউক্রেন ১১১—তবু ভারত ১১৬। অর্থাৎ, ট্যাঙ্কের শব্দের চেয়েও বেশি অসুখী করছে আমাদের একাকিত্ব।
*৬. কেন বাড়ছে না সুখ? গবেষকদের পাঁচ কাঁটা*
– *বৈষম্য*: আয়-বৈষম্য জীবন-সন্তুষ্টির বৈষম্য বাড়ায়।
– *সামাজিক সহায়তা*: ‘বিপদে কে আছে’—এই প্রশ্নে ভারত ১২৩।
– *মানসিক স্বাস্থ্য*: প্রতি সাত জনে এক জন মানসিক চ্যালেঞ্জে, চিকিৎসা অপ্রতুল।
– *বিশ্বাস-ঘাটতি*: প্রতিষ্ঠান ও পরস্পরের প্রতি আস্থা কম, যা সুখ টেনে নামায়।
– *আকাঙ্ক্ষা বনাম আশ্বাস*: স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে, কিন্তু স্বপ্নপূরণের সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক আশ্বাস নেই। c48d5e6eb7c5
*৭. তা হলে পথ কী?*
রিপোর্টের ইঙ্গিত স্পষ্ট: জিডিপি নয়, জি.ডি.পি—গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট নয়, গ্রস ডোমেস্টিক পিস। অর্থাৎ, পাড়ার চায়ের দোকানে আড্ডা, বিপদে প্রতিবেশীর দরজা ধাক্কা দেওয়ার সাহস, অফিসে ‘ভাল আছো?’ প্রশ্নের সময়। নর্ডিক দেশগুলোয় হারানো মানিব্যাগ ফেরত পাওয়ার বিশ্বাসই সুখের ব্যারোমিটার। আমাদের দরকার সেই ‘বিশ্বাসের অবকাঠামো’।
*শেষ লাইন: সিঁড়ি বেয়ে ওঠা*
সুখের সিঁড়িতে ভারতের পা পিছলাচ্ছে কারণ আমরা সিঁড়িটাকে একা বাইতে চাইছি। অর্থনীতি ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে, কিন্তু হাত ধরার লোক কমেছে। যত দিন না ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’-তে ফিরছি, যত দিন না রোজগারের পাশে সম্পর্কের ব্যালান্স শিট মিলছে, তত দিন ক্যানট্রিলের সিঁড়িতে আমাদের নম্বর ৪.৫-এর ঘরেই ঘুরপাক খাবে।
সুখ মানে শুধু পকেট ভারী নয়, পাশের মানুষটার কাঁধ ভারী কি না, সেটাও। এই সহজ অঙ্কটা মিললেই ভারতের হাসি-সূচকেও জোয়ার আসবে।







