পরিকাঠামো এবং কৃত্রিম মেধা: ভারতের ভবিষ্যৎ আর্থিক বৃদ্ধির দুই প্রধান চালিকাশক্ত
নয়াদিল্লি: ভারত তার অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পরবর্তী পর্যায়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, বিশ্বমানের পরিকাঠামো এবং কৃত্রিম মেধা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দেশের ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। ২০২৬ অর্থবর্ষের জন্য আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি তাঁর বার্ষিক বার্তায় জানিয়েছেন, যে সমস্ত দেশ ভৌত পরিকাঠামোর সঙ্গে ডিজিটাল বুদ্ধিমত্তাকে সফলভাবে সংযুক্ত করতে পারবে, আগামী দশকগুলিতে তারাই বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে। প্রযুক্তি এবং পরিকাঠামোর সম্পর্ক বর্তমানে একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ছে। আগে রাস্তা, বন্দর বা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা তৈরি করে তার সঙ্গে প্রযুক্তি যুক্ত করার যে প্রথাগত পদ্ধতি ছিল, তা এখন বদলে গিয়ে এমন এক নতুন মডেল তৈরি হচ্ছে যেখানে পরিকাঠামো ও প্রযুক্তি একইসঙ্গে গড়ে তোলা হয়। এই সমন্বয়ের ফলেই আগামী দিনে প্রতিযোগিতার ক্ষমতা, ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতার রূপরেখা নির্ধারিত হবে। কৃত্রিম মেধা বা এআই-কে সাধারণত সফটওয়্যার-চালিত বিপ্লব হিসেবে দেখা হলেও, বাস্তব হল এটি ভৌত পরিকাঠামোর ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ডেটা সেন্টারগুলি চালানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক, কুলিং সিস্টেম এবং উচ্চ গতির ইন্টারনেট কানেক্টিভিটির প্রয়োজন হয়। বিশ্বজুড়ে এআই-চালিত পরিষেবার চাহিদা যত বাড়ছে, যে দেশগুলির পরিকাঠামোগত ভিত্তি মজবুত, তারা স্বাভাবিকভাবেই অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। অন্যান্য উন্নত দেশগুলি যেখানে তাদের বহু পুরনো পরিকাঠামোর কারণে কিছুটা পিছিয়ে পড়ছে, সেখানে ভারতের কাছে একেবারেই গোড়া থেকে আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার এক সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। এর ফলে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি, লজিস্টিকস, পরিবহণ, স্টোরেজ এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর মতো ক্ষেত্রগুলি বিচ্ছিন্নভাবে না গড়ে উঠে একটি সুসংহত ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রের অংশ হিসেবে বিকশিত হতে পারবে। ভৌত এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর এই সংযুক্তিকরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হল আদানি গ্রুপের বর্তমান ব্যবসায়ের রূপরেখা। বন্দর, বিমানবন্দর, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি, ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক, লজিস্টিকস, উৎপাদন এবং ডেটা সেন্টারের মতো ক্ষেত্রগুলিতে তাদের উপস্থিতি মূলত এমন একটি সংযুক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে, যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বড় মাপের প্রযুক্তিগত উন্নতিতে সাহায্য করবে। ২০২৬ অর্থবর্ষে আদানি গ্রুপের বিনিয়োগ তাদের এই দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যেরই প্রতিফলন। এই বছর তাদের মূলধনী ব্যয় বা ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার ১.৫ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎপাদন ক্ষমতা ১৯.৩ গিগাওয়াট অতিক্রম করেছে। পাশাপাশি, আদানি পোর্টস ৫০০ মিলিয়ন টনেরও বেশি কার্গো পরিচালনা করেছে এবং ট্রান্সমিশন ব্যবসার অর্ডার পাইপলাইনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া নবি মুম্বই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং গ্রুপের ক্রমবর্ধমান ডেটা সেন্টার নেটওয়ার্কের মতো বড় প্রকল্পগুলির কাজও সমানতালে এগিয়ে চলেছে। তবে শুধু বিনিয়োগই যথেষ্ট নয়, আসল চ্যালেঞ্জ লুকিয়ে রয়েছে এই প্রকল্পগুলির সফল রূপায়ণের মধ্যে। আজকের এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে কত দ্রুত, দক্ষতার সঙ্গে এবং বড় আকারে মূলধন বিনিয়োগ করে তাকে সফল করা যায়, সেটাই চূড়ান্ত সাফল্যের নির্ণায়ক হবে। যে দেশগুলি তাদের বিনিয়োগকে কার্যকরী পরিকাঠামো এবং উৎপাদন ক্ষমতায় রূপান্তরিত করতে পারবে, তারাই এই দৌড়ে এগিয়ে থাকবে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার যখন জ্বালানি নিরাপত্তা, সাপ্লাই চেন বা সরবরাহ শৃঙ্খলের বাধা এবং নতুন প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাব নিয়ে চিন্তিত, সেই সময়ে এই বিনিয়োগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের জন্য আজ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, দক্ষ লজিস্টিকস এবং শক্তিশালী শিল্প ক্ষমতার ওপর নির্ভরতা ক্রমশ অপরিহার্য হয়ে পড়ছে। ভারতের কাছে এটি একইসঙ্গে বড় সুযোগ এবং দায়িত্ব। পরিবেশবান্ধব শক্তি, ডিজিটাল পরিকাঠামো, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন এবং গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই চেনে বিনিয়োগ শুধুমাত্র দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকেই ত্বরান্বিত করবে না, পাশাপাশি জাতীয় স্তরে প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ন্যাশনাল রেজিলিয়েন্সকেও শক্তিশালী করবে। বিশ্ব অর্থনীতি এখন প্রযুক্তি ও স্থায়িত্বের দ্বারা চালিত এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে মূলধনের প্রাপ্যতার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সেই মূলধনের যথাযথ ব্যবহার। এই প্রতিযোগিতায় পরিকাঠামো, প্রযুক্তি এবং বাস্তবায়নের মধ্যে সফল সমন্বয় সাধনের উপরেই নির্ভর করছে বিশ্বের প্রথম সারির অর্থনীতিগুলির মধ্যে ভারতের অবস্থান।







