Latest News
ফাইল লোপাট’-এর অভিযোগে উত্তপ্ত বেলিয়াবেড়া ব্লক অফিস, ভাইরাল ভিডিয়ো ঘিরে চাঞ্চল্য ১৩ জন বিধায়ক নির্বাচিত হলেও মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেলেন মাত্র একজন, পশ্চিম মেদিনীপুরে ক্ষোভ ও আক্ষেপ বিপজ্জনক কাঠের সেতুতে নিত্য যাতায়াত, ওড়িশা কোস্ট ক্যানেলের উপর কংক্রিটের সেতু গড়ার দাবিতে সরব বাদলপুর হাইকোর্টের নির্দেশে ঘাটাল শহরে উচ্ছেদ হচ্ছে চার দশকের পুরনো বাজার, চরম অনিশ্চয়তায় ব্যবসায়ীরা শূন্যস্থান পূরণে ওস্তাদ ‘অন্যরা’, জুন্টার হাত ধরেই উত্তর-পূর্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মরিয়া দিল্লি আরশোলা’দের রুদ্রমূর্তি! পরীক্ষা-দুর্নীতির প্রতিবাদে মার্কিন মুলুক ছেড়ে সোজা যন্তরমন্তরে সিজেপি কর্ণধার
Home » Uncategorized » ব্রোঞ্জের উল্লাস বনাম সোনার দম্ভ: বিশ্বমঞ্চে পদক-যুদ্ধে ভারতের অবস্থান ঠিক কোথায়?

ব্রোঞ্জের উল্লাস বনাম সোনার দম্ভ: বিশ্বমঞ্চে পদক-যুদ্ধে ভারতের অবস্থান ঠিক কোথায়?

Share:

অলিম্পিকের মার্চপাস্টে যখন একশো চল্লিশ কোটির দেশের পতাকাটা ওড়ে, বুকের ভিতরটা গর্বে ফুলে উঠলেও, গেমসের শেষে পদক তালিকার দিকে চোখ গেলেই একটা অদ্ভুত শূন্যতা গ্রাস করে। জনসংখ্যার নিরিখে আমরা চিনের সমকক্ষ হতে পারি, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রের রূঢ় বাস্তব জমিতে দাঁড়ালে সেই সাম্যের অহংকার নিমেষে চূর্ণ হয়ে যায়। বেজিং বা সাংহাইয়ের দিকে তাকালে দেখবেন, সেখানে খেলাধুলো কোনো নিছক শখ নয়, আস্ত একটা রাষ্ট্রীয় কারখানা। ‘জুগুও তিজি’ নামের সেই মহাযজ্ঞে একেবারে শৈশব থেকে প্রতিভাকে ছাঁচে ফেলে তৈরি করা হয় এক একজন পদক-জেতা রোবট। খাওয়া, পরা, প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে স্পোর্টস সায়েন্স—সবকিছুর দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর এপারে? আমাদের দেশে কোনো পদক সিস্টেমের হাত ধরে আসে না, বরং সিস্টেমের রক্তচক্ষু, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা আর লাল ফিতের ফাঁসকে হারিয়ে কোনো এক জেদি অ্যাথলিটের ব্যক্তিগত ঘাম আর চোখের জলেই সেই সাফল্যের জন্ম হয়।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামহলে কান পাতলেই একটা প্রচলিত আপ্তবাক্য শোনা যায়—টাকা নাকি পদক কেনে! কথাটা খুব একটা মিথ্যে নয়। জিডিপি বা দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে অলিম্পিক সাফল্যের একটা গভীর নাড়ির টান রয়েছে। গ্রেট ব্রিটেনের মতো দেশগুলো লটারির কোটি কোটি পাউন্ড ঢেলে আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্সের ভোল বদলে দিয়েছে। একজন অ্যাথলিটের ঘুমের স্পন্দন থেকে শুরু করে পেশীর সংকোচন—সব মাপা হয় অত্যাধুনিক বায়োমেট্রিক্স ল্যাবে। কিন্তু ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি হয়েও পদকের দৌড়ে কেন এত পিছিয়ে? উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের মাথাপিছু আয়ের অঙ্কে। সামগ্রিক জিডিপি হয়তো পাহাড়প্রমাণ, কিন্তু সেটা যখন বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে ভাগ হয়, তখন ক্রীড়া পরিকাঠামোর চেয়ে রাষ্ট্রের কাছে দু’বেলার অন্ন আর স্বাস্থ্যের দাবিটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। তাই বিশাল অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও, পাড়ায় পাড়ায় আধুনিক স্পোর্টস কমপ্লেক্স বা উন্নত ডায়েট আমাদের প্রান্তিক প্রতিভাদের কাছে আজও এক বিলাসী স্বপ্ন।

অবশ্য টাকা থাকলেই যে সব হয়, জ্যামাইকা বা কেনিয়ার অ্যাথলিটরা ট্র্যাকে নামলে সে কথা খাটে না। দারিদ্র্যের গণ্ডি পেরিয়েও উসেইন বোল্টদের দৌড় প্রমাণ করে যে, জিনগত সুবিধা আর প্রবল সামাজিক আবেগ থাকলে জিডিপি-র হিসাব অনায়াসেই উল্টে দেওয়া যায়। কিন্তু আমাদের দেশে সমস্যাটা আরও গভীরে। ক্রিকেট-সর্বস্ব এই দেশে অন্যান্য খেলাগুলো আজও প্রচার আর স্পনসরশিপের অভাবে ধুঁকছে। কুস্তি ফেডারেশনের কর্তাদের বিরুদ্ধে দেশের শীর্ষ কুস্তিগীরদের দিল্লির রাজপথে সেই দীর্ঘকালীন লড়াই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, খেলাধুলোয় রাজনৈতিক নেতাদের আধিপত্য কীভাবে প্রতিভার টুঁটি চেপে ধরে। পরিকাঠামোর অভাবের চেয়েও এই প্রশাসনিক গাফিলতি আমাদের ক্রীড়াক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় ক্যানসার।

তবে এই ঘন অন্ধকারের মধ্যেও দুটো রাজ্যের নাম প্রবল আশার আলো দেখাচ্ছে। হরিয়ানা এবং ওড়িশা। দুটো রাজ্য, কিন্তু বিশ্বমঞ্চে তাদের জয়ের ব্যাকরণ সম্পূর্ণ আলাদা। রোহতক বা সোনিপতের ধুলোমাখা আখড়ায় তৈরি হওয়া হরিয়ানা মডেল দাঁড়িয়ে আছে সরাসরি আর্থিক নিরাপত্তার ভিতের ওপর। অলিম্পিক থেকে পদক আনলে কোটি টাকার চেক আর নিশ্চিত সরকারি চাকরি—এই মন্ত্রেই ওরা তৈরি করছে বিনেশ বা নীরজদের। সমাজের চোখে খেলাধুলো সেখানে এক সম্মানজনক পেশা। অন্যদিকে, ওড়িশা বেছে নিয়েছে এক অন্য পথ। ব্যক্তি নয়, তারা জোর দিয়েছে কাঠামোর ওপর। হকি যখন স্পনসরহীন হয়ে ধুঁকছে, তখন ওড়িশা সরকার এগিয়ে এসে আন্তর্জাতিক মানের হকি স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে হাই-পারফরম্যান্স সেন্টার তৈরি করেছে। ব্লক স্তরে মাল্টি-পারপাস স্টেডিয়াম বানিয়ে স্পোর্টস ইকোসিস্টেমকে কর্পোরেট পেশাদারিত্বে মুড়ে ফেলেছে ভুবনেশ্বর।

হরিয়ানার লড়াকু গ্রামীণ জেদ আর ওড়িশার অত্যাধুনিক স্পোর্টস পরিকাঠামো—এই দুয়ের মেলবন্ধনই হতে পারে আগামী দিনের ভারতের অলিম্পিক সাফল্যের আসল ব্লু-প্রিন্ট। অলিম্পিকের ঠিক তিন মাস আগে হঠাৎ জেগে উঠে কোটি টাকার পুরস্কার ঘোষণা করলেই পদক আসে না। তার জন্য প্রয়োজন দশ বছর আগে থেকে বীজ বোনার অসীম ধৈর্য। ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে বৃহত্তর সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং স্পোর্টস ফেডারেশনগুলোকে রাজনীতির পঙ্কিল আবর্ত থেকে মুক্ত করতে না পারলে, বৈশ্বিক পদক তালিকার ওই তলানিতেই আমাদের পড়ে থাকতে হবে। আর চার বছর অন্তর শুধু ব্রোঞ্জ জয়ের উল্লাসে মেতে সোনার দম্ভকে দূর থেকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে।

সুনীপম মহাকুল

Leave a Comment