Home » Uncategorized » লকডাউনের ভূত, বাস্তবের ভয়: এপ্রিল ফুলে হুল ফুটল

লকডাউনের ভূত, বাস্তবের ভয়: এপ্রিল ফুলে হুল ফুটল

Share:

দুপুর গড়ানোর আগেই, দেশের বহু বাড়িতে একই প্রশ্ন ঘুরছিল—“আবার কি লকডাউন?”
কেউ বলছিল তেল শেষ হয়ে যাবে, কেউ বলছিল সেনা নামবে রাস্তায়। বার্তাগুলো একরকম—সরকার নাকি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, ২০২০-এর মতোই সব বন্ধ হবে। কোনও অফিসিয়াল ঘোষণা নেই, তবু আতঙ্কটা ছিল বাস্তব।

এই আতঙ্কের কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই। কেন্দ্র সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, দেশে কোনও ‘ওয়ার লকডাউন’ জারি করা হচ্ছে না, এমন কোনও পরিকল্পনাও নেই।
তবু কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গুজবটা এমনভাবে ছড়াল, যেন সত্যিই কিছু একটা ঘটতে চলেছে।

এই ঘটনাটা শুধু একটা ভুয়ো বার্তার গল্প নয়। এটা আসলে সেই মানসিক অবস্থার গল্প, যেখানে একটা সমাজ খুব সহজেই আতঙ্ককে সত্যি বলে ধরে নিতে প্রস্তুত হয়ে যায়।

গুজবটা তৈরি করা হয়েছিল খুব হিসেব করে। বার্তায় ছিল সরকারি অর্ডারের নম্বর, মন্ত্রকের নাম, এমনকি অফিসিয়াল লেটারহেডের মতো ডিজাইন। কেউ কেউ তাতে যোগ করেছিল নতুন তথ্য—হরমুজ প্রণালী বন্ধ, জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে, পরিবহন থেমে যাবে। পিডিএফ ফাইল ওপেন করলে এপ্এরিল ফুল। এই সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক ধরনের “বিশ্বাসযোগ্য মিথ্যা”। অনেকে তো না দেখেই বিশ্বাস করে নিচ্ছিল।

কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়—মানুষ এত দ্রুত বিশ্বাস করল কেন?

উত্তরটা খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় গত কয়েক সপ্তাহে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, জ্বালানির দামের চাপ, টাকার মূল্য পতন—এই সব খবর নিয়মিত পৌঁছেছে সাধারণ মানুষের ঘরে। সেই সঙ্গে ছিল এক অদৃশ্য স্মৃতি—কোভিড।
যে সময়ে হঠাৎ করে জীবন থেমে গিয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা এখনও তাজা। ফলে “লকডাউন” শব্দটা আর কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটা এখন এক ধরনের মানসিক ট্রিগার।

তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি জিনিস—সময়। ১ এপ্রিল।
এই দিনটায় মানুষ জানে, অনেক কিছুই মজা হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে একটা দ্বিধাও কাজ করে—যদি সত্যি হয়? এই “যদি” শব্দটাই গুজবকে বাঁচিয়ে রাখে।

এবং তারপর আসে প্রযুক্তি।
একটি বার্তা যখন ব্যক্তিগত চ্যাটে আসে—বন্ধুর কাছ থেকে, আত্মীয়ের কাছ থেকে—তখন সেটাকে মানুষ সংবাদপত্রের খবরের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করে। কারণ, সেটা “বিশ্বাসের নেটওয়ার্ক”-এর ভিতর দিয়ে আসে।
এই বিশ্বাসই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গুজবকে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।

সরকারি স্তরে খণ্ডন এলেও, ততক্ষণে বার্তাটা নিজের কাজ করে ফেলেছে। গুগলে সার্চ বেড়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা শুরু হয়েছে, বাড়ির ভেতরে ভেতরে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

এই ঘটনাটা আমাদের সামনে একটা বড় প্রশ্ন রেখে যায়—তথ্যের যুগে আমরা কি সত্যিই বেশি জানি, না কি আমরা আরও বেশি বিভ্রান্ত?

কারণ বাস্তব পরিস্থিতি জটিল। আন্তর্জাতিক সংঘাত আছে, অর্থনৈতিক চাপ আছে, নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা চলছে। এগুলো সত্যি।
কিন্তু সেই বাস্তবের ফাঁকেই ঢুকে পড়ছে মিথ্যা, এবং অনেক সময় সেই মিথ্যাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

শেষ পর্যন্ত, এই গল্পটা লকডাউনের নয়।
এটা বিশ্বাসের গল্প—কীভাবে আমরা তথ্যকে বিশ্বাস করি, কাকে বিশ্বাস করি, আর কোন মুহূর্তে ভয় আমাদের বিচারক্ষমতাকে ছাপিয়ে যায়।

এবং হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা—
সবচেয়ে বিপজ্জনক গুজব সেইটা নয়, যেটা মিথ্যা।
সবচেয়ে বিপজ্জনক গুজব সেইটা, যেটা সত্যি বলে মনে হয়।

Leave a Comment